বাংলার মানুষের প্রিয় এই লেখক তার ৬১তম জন্মদিনে বলেন,
মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত লিখে যেতে চাই। লেখালেখিই আমার বিশ্রাম। লেখালেখি
বন্ধ হলে আমার বেঁচে থাকা অর্থহীন হয়ে পড়বে, আমি বাঁচতে পারব না।
পাঠকদের উদ্দেশ্যে তার আবেদন- 'দোয়া করবেন, আমি যেন আমৃত্যু লিখে যেতে
পারি। হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লিখে গেছেন। হাসপাতালের বেড়ে
অপারেশনে যাবার আগ পর্যন্তই তার কলম সচল ছিল । মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে
মুক্তিযুদ্ধের সময় অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এ যাত্রা
ঘাতক ক্যান্সারকে ফাকি দিতে পারলেন না। চলে গেলেন অকালে। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাকে আটক করে এবং
নির্যাতনের পর হত্যার জন্য গুলি চালায়। তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। ২০১১
সালের সেপ্টেম্বর মাসে তার দেহে অন্ত্রীয় ক্যান্সার ধরা পড়ে। ২০১১ সালের
১৪ সেপ্টেম্বর। হুমায়ূন আহমেদ চিকিৎসার জন্য নিউইয়র্ক যান। প্রথমে
মেমােরিয়াল সােলান ক্যাটারিং হাসপাতালে ড. স্টিফেন আর ভিচের তত্ত্বাবধানে
তিনটি ক্যামােথেরাপী নেন। পরবর্তী সময়ে নিউইয়র্ক শহরের ম্যানহাটানের
বেলভ্যু হাসপাতালে অনকোলজি বিভাগের ডা. জেইনের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা করান।
প্রথম পর্যায়ে ৮টি ক্যামােথেরাপি দেয়ার কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে
ক্যান্সারের নিরাময়ে কার্যকরী ভূমিকা নেয়ায় মােট ১২টি কেমোথেরাপি দেয়া
হয়। বেলভ্যু হাসপাতালের চিকিৎসক ড. জেইন এমআরআই, সিটি স্ক্যান সহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে
ক্যান্সার বিভাগের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টিম গঠন করেন। সার্জিকাল
অনকোলজি বিভাগের ডাক্তার জর্জ মিলার সমস্ত রিপাের্ট দেখে গত ৭ জুন
অপারেশনের মাধ্যমে হুমায়ুন আহমেদের ক্যান্সার রোগ নিরাময় হওয়া সম্ভব বলে
মত দেন। এ বছরের ১২ জুন অস্ত্রোপচারের তারিখ নির্ধারণ করেন চিকিৎসক।
অপারেশনের আগে বাংলাদেশ ঘুরে আসার অনুমতি চাইলে চিকিৎসকরা লেখককে অনুমতি
দেয়ার ৪৮ ঘন্টার মধ্যে তিনি বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। তার ইচ্ছা
ছিল মায়ের সঙ্গে দেখা করে তার নুহাশ পল্লী ঘুরে গিয়ে অপারেশন করাবেন।
চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের ১০ দিন আগে লেখককে আমেরিকায় সুস্থভাবে ফিরে আসার
জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। অপারেশন ঠিকঠাকই হয়েছিল। কিন্তু অপারেশনের পর
দেখা দেয় জটিল । এরপর আবারও অপারেশন করা হয়। এরপর থেকেই দেখা দেয়
জটিলতা।
জীবনযুদ্ধে নানা দুঃখ-কষ্টের মুখােমুখি হতে হলেও লেখক হিসাবে তিনি প্রথম
থেকেই বাংলার পাঠকের হৃদয়ে স্থান করে নেন। নন্দিত নরকে শংখনীল কারাগার এ
দৃটি উপন্যাস দিয়ে যান। এক জায়। এরপর গত চার দশকে ভারত আকাশ স্পর্শ
করেছে। তাকে ছাপিয়ে আর কোন লোকই আজ পর্যন্ত পাঠকের মনে স্থান করে নিতে
পারেনি। লেখক হিসাবে ঈর্ষণীয় অবস্থানে বিরাজ করছেন তিনি। শুধু উপন্যাস বা
ছােট গল্প নয় সংস্কৃতির যে মাধ্যমে হাত দিয়েছেন জনপ্রিয়তা যেন তার পায়ে
লুটোপুটি খেয়েছে। টিভি নাটক, চলচ্চিত্র এমনকি কবিতা রচনা সবকিছুই পাঠক
পরম আদরে বুকে তুলে নিয়েছে। অনন্য সব উপন্যাসের পাশাপাশি তিনি বাংলা
সাহিত্যে সৃষ্টি করেছেন জনপ্রিয়তম দুটি চরিত্র হিমু ও মিসির আলী। তার
উপন্যাসের পাশাপাশি এ দুটি চরিত্রও তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বাংলা
সায়েন্স ফিকশন রচনাতেও তিনিই পথিকৃৎ। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা আড়াই
শতাধিক। অতুলনীয় জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও তিনি অন্তর্মুখী চরিত্রের এই
মানুষটি অনাড়ম্বরভাবে চলাফেরা করেন। তার বেশ কিছু গ্রন্থ পৃথিবীর নানা
ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বেশ কিছু গ্রন্থ স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের
পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত। হুমায়ুন আহমেদের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর
নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে। তার পিতা ফয়জুর রহমান আহমদ
এবং মা আয়েশা ফয়েজ। তার পিতা একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন এবং তিনি ১৯৭১
সালে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। তার অনুজ মুহম্মদ জাফর ইকবাল দেশের আরেক
জনপ্রিয় সাহিত্যিক ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষক। সবার ছােট ভাই আহসান হাবীব রম্য সাহিত্যিক এবং কার্টুনিস্ট।
ছোটবেলায় হুমায়ুন আহমেদের নাম ছিল শামসুর রহমান; তার পিতা নিজ নাম ফয়জুর
রহমানের সাথে মিল রেখে ছেলের নাম রাখেন শামসুর রহমান। পরবর্তীকালে তিনি
নিজেই নাম পরিবর্তন করে হুমায়ূন আহমেদ রাখেন। হুমায়ূন আহমেদের প্রথম
স্ত্রীর নাম গুলতেকিন আহমেদ। তাদের বিয়ে হয় ১৯৭৩ সালে। প্রথম স্ত্রীর ঘরে
তার তিন মেয়ে এবং দুই ছেলে জন্মগ্রহণ করে। তিন মেয়ের নাম বিপাশা আহমেদ,
নােভা আহমেদ, শীলা আহমেদ এবং ছেলের নাম নুহাশ আহমেদ। অন্য আরেকটি ছেলে
অকালে মারা যায় । ১৯৯০ সালে অভিনেত্রী শাওনের সাথে হুমায়ুন আহমেদের
ঘনিষ্ঠতা হয়। পরে ২০০৫ সালে গুলতেকিনের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের পর তিনি
শাওনকে বিয়ে করেন। শাওনের ঘরে তার তিন সন্তান জন্মগ্রহণ করে। প্রথম কন্যা
মারা যায়। পরের দুই ছেলের নাম নিষাদ হুমায়ুন ও নিনিত হুমায়ূন। হুমায়ূন
আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে বিএসসি ও এমএসসি ডিগ্রি লাভ
করেন। পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি
থেকে পলিমার রসায়ন বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি লাভ করেন। তার কর্মজীবন শুরু
হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে।
পরবর্তীকালে তিনি অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে লেখালেখিতেই পুরােপুরি আত্মনিয়ােগ
করেন। পাশাপাশি চলতে থাকে চলচ্চিত্র নির্মাণ, নাটক নির্মাণ। এ পর্যন্ত
অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। এর মধ্যে উল্লেখযােগ্য হচ্ছে: বাংলা
একাডেমী পুরস্কার, শিশু একাডেমী পুরস্কার, একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র
পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ কাহিনী ১৯৯৩, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ১৯৯৪, শ্রেষ্ঠ সংলাপ
১৯৯৪), লেখক শিবির পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন পদক, বাকশাস পুরস্কার,
হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার, জয়নুল আবেদীন স্বর্ণপদক প্রভৃতি। দেশের
বাইরেও সম্মানিত হয়েছেন হুমায়ুন আহমেদ জাপানের 'NHK' টেলিভিশন তাঁকে
নিয়ে Who is who in Asia' শিরােনামে পনের মিনিটের একটি ডকুমেন্টারি প্রচার
করে। হুমায়ূন আহমেদের উল্লেখযােগ্য সাহিত্য উপন্যাস: নন্দিত নরকে,
লীলাবতী, কবি, শঙ্খনীল কারাগার, মন্দ্রসপ্তক, দূরে কোথায়, সৌরভ, নী, ফেরা,
কৃষ্ণপক্ষ, সাজঘর, বাসর, গৌরীপুর জংশন, নৃপতি, অমানুষ, বহুব্রীহি, এইসব
দিনরাত্রি, দারুচিনি দ্বীপ, শুভ্র, নক্ষত্র রাত, কোথাও কেউ নেই, আগুনের
পরশমনি, শ্রাবণ মেঘের দিন বৃষ্টি ও মেঘমালা, মেঘ বলেছে যাবো যাবো, জোছনা ও
জননীর গল্প প্রভৃতি। চলচ্চিত্র: আগুনের পরশমনি, শ্যামল ছায়া, শ্রাবণ মেঘের
দিন, দুই দুয়ারী, চন্দ্রকথা, নয় নম্বর বিপদ সংকেত।
লেখকঃ আসিফ আহমদ
চাঁদপুর, হাজীগঞ্জ।
চাঁদপুর, হাজীগঞ্জ।


0 Comments