আমি রাজনীতির মানুষ নই, ফলে ভারতীয় রাজনীতিতে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের কী অবদান, কী ভূমিকা ছিল তা আমার জানা নেই। কিন্তু আমার এই মুহুর্তে এই ভেবে কষ্ট হচ্ছে ভারতবর্ষ এমন এক রাষ্ট্রপতিকে পেয়েছিল যিনি ভারতের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে ভাল বাসতেন, সম্মান করতেন। এবং সবথেকে বড় কথা হল সেই সাহিত্য সংস্কৃতি কিন্তু চোখধাঁধানো এলিট লেভেলের নয়, বরং একেবারে গ্রাসরুট লেভেলের। হ্যাঁ আমি নিজে তার সাক্ষী ছিলাম বলেই আজ এই কথাগুলো বলছি। ২০১২ সালে প্রণব মুখোপাধ্যায় ওই সুবিশাল প্রাচীরে ঢাকা এক আশ্চর্যনগরী যার নাম রাষ্টপতিভবনের প্রধান সিংহাসনটিতে বসার পর কী করেছিলেন? প্রথমেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন এই ভবনের প্রতিটি দরজা দেশের মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হোক। দেশের জনগণের অধিকার রয়েছে এই রাষ্ট্রপতিভবনের অসাধারণ মুঘল গার্ডেন কিংবা মিউজিয়মকে ঘুরে দেখার। খুলে গেছিল দ্বার।
আর কী করেছিলেন? তিনি ঘোষণা করেছিলেন এই দেশের উন্নতির অন্যতম স্তম্ভ হল শিল্পী, সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক, শিক্ষক এবং ছাত্ররা। এঁরা দেশের আত্মিক কল্যাণ করেন সুতরাং রাষ্ট্র যদি এই মানুষগুলিকে যথোচিত সম্মান না জানায় সেটা দেশের পক্ষে অসম্মানজনক। তাই তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাহিত্যিক, শিক্ষক, ছাত্র, শিল্পী, এবং সেই সকল প্রযুক্তিবিদ যাদের কোনও প্রথাগত বিদ্যা নেই কিন্তু রয়েছে অসামান্য প্রতিভা, তাঁদের নিয়ে এলেন রাষ্ট্রপতিভবনে খোদ নিজের অতিথি করে। সম্মান জানালেন। তাদের সঙ্গে কথা বললেন। আরও অনেক কিছু।
![]() |
| সদ্য প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও লেখক বিনোদ ঘোষাল |
২০১৬ সালে আমি, এক সামান্য বাংলা ভাষার কলমচি, অলৌকিকভাবে আমন্ত্রণপত্র পেয়েছিলাম এই মানুষটির কাছ থেকে। রাইটার্স ইন রেসিডেন্স প্রোগ্রাম। পুরো চোদ্দদিন মাননীয় রাষ্ট্রপতির আতিথ্য লাভের এক আশ্চর্য সম্মান। ওই চোদ্দটা দিনে অনেক অনেক ঘটনা। অনেক অভিজ্ঞতা। সে নিয়ে অনেক কথা বলা যায়, কিছু কখনও বলেওছি। কিন্তু নিজে চোখে যা দেখেছি প্রণববাবু রাষ্ট্রপতিভবনে এনেছিলেন এক সাংস্কৃতিক বিপ্লব। মূল ভবণের যে অসামান্য গ্রন্থাগারটি যেখানে কয়েকশো বছরের পুরনো গ্রন্থ রয়েছে, ( আমার নিজের সৌভাগ্য হয়েছিল লর্ড ক্লাইভের হস্তাক্ষর দেখার) তার ডিজিটালাইজেশন করানো, এ ছাড়া স্বীয় নামে আরও একটি গ্রন্থাগার তিনি নির্মাণ করেছিলেন ভবনচত্ত্বরে, মিউজিয়মটিকে সাজিয়েছিলেন ঢেলে। আমরা সেবার ডাক পেয়েছিলাম দু'জন সাহিত্যিক, একজন নাট্যকার, একজন ভাস্কর এবং সাতজন প্রযুক্তিবিদ। ওই সাতজনের মধ্যে বেশ কয়েকজন ছিলেন প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা, তাদের গায়ে মাটির গন্ধ, প্রথাগত বিদ্যা নেই, কিন্তু প্রতিভাবলে এমন কোনও যন্ত্র আবিস্কার করেছেন যা মানুষের কল্যানে ব্যবহৃত হচ্ছে। আমি সেই দৃশ্য দেখেছি যেখানে অতি সাধারণ একটি পোশাক পরা এক কৃষক তিনি বসে রয়েছেন রাষ্ট্রপতিভবনের ঐতিহ্যশালী ক্যাবিনেট্রুমে। এবং তিনি বলছেন তার কথা, মাননীয় রাষ্ট্রপতিসহ দেশের অনেক পদস্থ ব্যক্তিও শুনছেন সেই অচেনা মানুষটির কথা। এই সুযোগ, এই সম্মান প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। জানি না এর আগে এইভাবে আর কোনও দেশপ্রধান ভেবেছিলেন কি না। ভেবেছিলেন একজন বাঙালি রাষ্টপ্রধান।
আমার মনে পড়ছে ওই ক্যাবিনেট রুমে আমাদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছিলেন, 'আপনারা সকলে আমার বিশেষ অতিথি। বিশেষ এই কারণে বলছি কারণ একটি দেশের প্রকৃত উন্নতি শুধুমাত্র আর্থিকভাবে ঘটতে পারে না। আত্মিক উন্নতি ছাড়া দেশের প্রকৃত উন্নতি সম্ভব না। আর সেই আত্মিক উন্নতির কান্ডারী আপনারা। আমরা আপনাদের সম্মান জানিয়ে নিজেদের সম্মানীত করছি। আমার সৌভাগ্য যে আপনারা আমার আতিথ্য স্বীকার করেছেন'।
ওঁর মুখ থেকে যখন এই কথাগুলো বেরিয়ে আসছিল আমি হাঁ করে তাকিয়ে শুনছিলাম। বিশ্বাস হচ্ছিল না, একজন দেশের প্রধান এইভাবেও ভাবতে পারেন!
আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ ডানাওলা মানুষ উপহার দিলাম ওঁকে। পৃষ্ঠা ওল্টাতে থাকলেন, একসময় দেখিঁ বুঁদ হয়ে পড়ছেন। ওদিকে মিটিং চলছে। মাননীয়া সেক্রেটারি অমিতা পল ম্যাডাম তখন তাঁর বক্তব্য রাখছেন, বেশ কিছুক্ষণ পর আচমকাই যেন সম্বিত ফিরল তাঁর। বইটি আশে রেখে দিলেন। সেদিন তাঁর বক্তব্যের প্রথম লাইনটি ছিল-'আমি দুঃখিত, হাতে একটি বাংলা বই এসে পড়ায় অল্প সময়ের জন্য মিটিং -এ মন রাখতে পারিনি।'
এই অহংকার আমার আজীবন রইবে।
প্রণাম ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়কে।



0 Comments