Advertisement

উন্মেষ

আমার গল্পে গল্প থাকে, প্রত্নতাত্ত্বিক খনন করা লাগে না : নাসিমা আনিস


নাসিমা আনিস-এর জন্ম ১৬ নভেম্বর, ১৯৬২, কুমিল্লায়। আজিমপুর গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি, ইডেন কলেজ থেকে এইচএসসি, চট্টগ্রাম কলেজ থেকে অনার্স ও চট্টগাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে মাস্টার্স করেন ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে। পেশা শিক্ষকতা। তার জীবনসঙ্গী গল্পকার ও গবেষক হাবিব আনিসুর রহমান।

নব্বইয়ের দশকে ছোটগল্প দিয়েই সাহিত্যে প্রবেশ। মাঝখানে প্রায় দশ বছর বিরতি। প্রথম গ্রন্থ কাগজ প্রকাশন কর্তৃক তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাস ‘মোহিনীর থান’। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘পিদিমের হবিষ্যি’ (পাঠসূত্র), ‘কিডনির কারবার’ (নান্দনিক)। অন্যান্য উপন্যাস : ‘চন্দ্রভানুর পিনিস’ (মাওলা ব্রাদার্স) ‘বৃহন্নলা বৃত্তান্ত’ (মাওলা ব্রাদার্স), স্বপ্ন আমরা বাঁচবো (নান্দনিক)। শিশুতোষ উপন্যাস ‘কুয়াশা কুয়াশা ভোর’, ‘সূর্য ওঠার সময়’ (ঝিঙেফুল)। 

তিনি এ বছর কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন।

শফিক হাসান : আপনার গল্প লেখা শুরু কখন, কীভাবে?
নাসিমা আনিস : সিক্স/সেভেনে পড়ার সময় কিছু কাহিনী লিখেছিলাম। খুব সম্ভব পাড়ার কারো মৃত্যুতে খুব আহত বোধ করেছিলাম আর আমার একেবারে শিশু বয়সে জগন্নাথ হলের বাংলোতে থাকার সময় অসাধারণ একটা গোলাপ বাগান ছিলো সেখানে। একটা ঝোঁক ছিলো সাহিত্যের প্রতি তখন থেকেই। পয়সা জমিয়ে কিশোর বাংলা কেনা, প্রতিবেশীর কাছ থেকে ধার করে বিচিত্রা, পূর্বাণী পড়া ছিলো নৈমিত্তিক। ঘরে ইত্তেফাক আর বেগম ছিলো নিয়মিত, মধ্যবিত্তের পরিবার যেমন ছিলো তখন। চিঠিপত্র লেখার ঝোঁক ছিলো। ঘরে কোনো বইয়ের আলমারি ছিলো না। আলমারি ছিলো সিরামিকের থালঘটিতে ভরা। অনেক ডিকশনারি আর গল্পের বই এর ওর টেবিলের সেলফে দু’চারটে করে পড়ে থাকতো, সুযোগ মতো গল্পের বইয়ের রিভিশন হতো। এইটে পড়ার সময় আমার সামনে একটা দরোজা খুলে যায়, আমার মায়ের একটা মস্ত ট্রাংক, যেটা খাটের নিচের অর্ধেকটা করে থাকতে দেখেছি, সেটার দখল পাই। ট্রাংকভর্তি গল্পের বই। পঞ্চাশের দশকে মায়েদের (বাবার অন্য সহকর্মীদের স্ত্রীগণসহ)। বিনোদন ছিলো বিকেলে নিউ মার্কেটে ঘুরতে বের হওয়া, চিনা বাদাম, ঝালমুড়ি খাওয়া এসব। খুব বেশি হলে একগাছি কাচের চুড়ি, দু’ গজ সাদা বা কালো ফিতা। মা মাঝে মাঝে একটা করে বই কিনতেন। এসব সেই বই। বইগুলো মনে হয় মা বারবার পড়েছেন, মলিন খুব। আর কোনোটার কোনোটার সামনের পিছনের দু’একপাতা করে নেই। আমার পড়ায় তাতে খুব ব্যাঘাত ঘটেনি। সে বয়সে লেখক নিয়ে মাথাব্যথা ছিলো না। গল্পটা পড়ে মজা পেলাম কিনা সেটাই ব্যাপার। গল্পের প্রতি ঝোঁক তখন থেকে। মোটা বই পড়তে সাহস পেতাম না কারণ বেশিরভাগ সময় লুকিয়ে পড়তে হতো উপন্যাস। বার্ষিক পরীক্ষার পর একমাস ছাড়া মোটা গল্পের বই হাতে দেখলে মা বিরক্ত হতেন, উপন্যাস দেখলে বেশি হতেন। মায়ের শরৎ ছিলো বেশি। প্রতিভা বসুর ‘মাধবীদের জন্য’ জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ‘সিতাংশু তোর সমস্ত কথা’ গল্পের বই দুটি ছিলো আমার খুব প্রিয়। পরের বইটা বাবার কেনা, সত্তরের দশকের। শরৎ-এর একটা গল্পগ্রন্থও ছিলো।

৮১ সালে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ার সময় বিএড-এর এক ছাত্রীকে গল্প লিখে দিতে হয়েছিলো, তার কী কাজে লেগেছে সেটা মনে নেই। গল্পটা নাকি ভালো হয়েছিলো সেই প্রথম বড়দের গল্প লেখা। আমি জানতাম আমি লিখবো। কিন্তু কখন থেকে লিখবো সেটা জানতাম না। পরিবারে সবাই গল্পের বইয়ের পাগল কিন্তু লেখক বলতে পত্রলেখক। লেখক থাকলে ভালো হতো। সাহস হতো। অল্প বয়সে প্রেম করে বিয়ে করে ফেলায় পরিকল্পিত কিছু এগোয়নি। আর আমি পরিকল্পনা করে খুব কিছু করতেও পারি না। স্বভাবে খানেকটা অস্থির আর অগোছালো। 

তো ৯৩/৯৪ সালে আহমেদ রেজার মাসিক ‘অনুসরণ’ নামে একটা পত্রিকায় আমার গল্প বেরোয়, সেই আমার সিরিয়াসলি লেখার সূত্রপাত। আমার একত্রিশ বছর বয়সে। বছর খানেক লেখালেখি করি তারপর প্রায় ছেড়ে দিই। কলেজে পড়াই, বাকি সময় বইখাতা নিয়ে বসে থাকলে ছোট ছেলেমেয়ে দুটো এতিমের মতো ঘুরে বেড়ায়, ব্যাপারটা ভালো লাগে না। তারপর ২০০২-এ সালাম সালেহ উদদীনের ‘অরুন্ধতী’তে বেরোয় গল্প ‘ত্রাতা’। তারপর চলছে লেখা ধীর গতিতে। আমি জীবনে দুটো বিষয়ে কখনো ব্যস্ত কি অস্থির হইনি- এক প্রেমে, দুই লেখালেখিতে। আনন্দ নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে আমি নারাজ। 

শফিক হাসান : গল্প লেখেন কেন?
নাসিমা আনিস : আমি আসলে পড়তেই তুলনামূলক বেশি ভালোবাসি। অখ্যাত অজানা লেখকের লেখাটাও আমি সমান গুরুত্ব দিয়ে পড়তে ভালোবাসি। আমি খুব বানিয়ে বানিয়ে কিছু লিখতে পারি না। কোনো লেখা পড়ার পর কিংবা পড়তে পড়তেই আমার কিছু অভিজ্ঞতা এমনভাবে উস্কানি পায় যে লিখতে মন চায়। আর এসব করতে করতে পরে যেটা হয় প্রতিদিন চলতে ফিরতে যে ঘটনাগুলো আলাদা, অন্য রকম, যেগুলো অনেকদিন মাথায় থেকে যায়, সেগুলো দূর করার বুদ্ধি কি! বুদ্ধি হলো তাদের অক্ষরে, বাক্যে, গল্পের ফাঁদে বন্দী করে ফেলা!

এখন কথা হলো এগুলো কেন লেখি। না লিখলেও কোনো ক্ষতি নেই, বরং উপকারই। পাঠককে এত উৎপীড়ন সইতে হতো না। এত লেখক এত বই, উৎপীড়ন নয়! তবুও লিখি মনে হয় একটা নতুন কিছু অভিজ্ঞতার কি আনন্দের যদি ভাগ দেয়া যায়। যদিও জানি সে বস্তু দুর্লভ। চোখ মেললেই যেখানে বিনে পয়সায় প্রভূত আনন্দ সেখানে মস্তিষ্ক খাটিয়ে আনন্দের দরকার কি! আমার সন্তানরা নব্বইয়ের দশকে বড় হয়েছে, স্কুল জীবনে বিনোদনের প্রায় পুরোটাই গল্পের বই। ঈদে কাপড়ের আগে বই দিতে হয়েছে ওদের, সেখানেই তাদের আনন্দ ছিল। এখন তাদেরও খুব বই পড়তে দেখি না।

শফিক হাসান : কী ধরনের বিষয়বস্তু নিয়ে গল্প লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
নাসিমা আনিস : জানি না কেন হয়, ঘুরেফিরে নারীই বেশি। আদিবাসী বুনোদের নিয়ে গল্প লিখেছি ‘পিদিমের হবিষ্যি’। ঐ নামেই আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ। বলছি ‘পিদিমের হবিষ্যি’ কিন্তু গল্পে পিদিমের স্ত্রী আর কন্যার জীবনযৌবনই চারিদিক থেকে ঘিরে রাখে। হিজড়াদের নিয়ে উপন্যাস লিখেছি দুটো, তাদের গল্পে বাঁধা যায়নি বলে উপন্যাস। হিজড়াদের আমি নারী হিসেবে উপস্থাপন করেছি কারণ তারা নিজেদের নারী ভাবতেই খুব ভালোবাসে। বস্তুত তারা নারীই, যৌনপ্রতিবন্ধী নারী। এদের প্রান্তিক বলে দূরে সরিয়ে রাখি, এদের দেখতে দেখতে আমরা এক ধরনের যৌনতাড়নায় লিপ্ত হই, এতেই যেন এ সমাজের আনন্দ, এটা বিকৃত এবং অসুস্থ অনুভব। আমি কম লিখি, বেশি লিখতে পারি না বলে না। যতটুকু লিখে নিজে আনন্দ পাই ততটুকু পর্যন্ত থাকি। খুব অল্প জানা অনালোকিত জায়গাগুলো নিয়ে লিখতে ভালো লাগে। সব সময় যদিও তা হয় না। গার্হস্থ্য মানুষের সক্রিয় শিল্পসত্তা টিকিয়ে রাখতে সব সময় তক্কে তক্কে থাকতে হয় সময় বের করতে, খুব মুশকিল।

শফিক হাসান : পাঠকদের উপর আপনার গল্পের প্রভাব কেমন?
নাসিমা আনিস : দেখেন লেখক-পাঠকরা প্রতিক্রিয়া জানালে জানাতে পারে। সেটা পাওয়াও যায়। কিন্তু শ্রেফ পাঠক যিনি, এমন পাঠকদের প্রতিক্রিয়া বেশি পাওয়ার সুযোগ কম। ‘সুবর্ণরেখা’য় ‘দিনকাল’ নামে আমার একটা গল্প বেরিয়েছিল ২০০৪-এর দিকে, যেটির নাম পাল্টে ‘কলিজা বিষয়ক গল্প’ নামে বইতে স্থান পায়, সেটা নিয়ে পাঠকরা আমায় কিছু প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। আমাদের গার্হস্থ্য জীবনের আশংকা, সন্দেহ আর অবিশ্বাসে ভরা, যা থেকে মানুষ সিজিওফ্রেনিকও সাব্যস্ত হতে পারে তার গল্প সেটা। গল্প পড়ে কলিজা খাওয়া ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে বিষয়টা নিয়ে ভাবনাটা বেশি জরুরি। যদিও আমি মনে করি না সমস্যা সংকট নিরসনের জন্য ছোটগল্পের কোনো রকম ভূমিকা আছে। পড়ে যদি মনে হয়, ‘ও আচ্ছা’ কিংবা ‘অহ্ তাই তো’, খুব বেশি হলে গালে হাত দিয়ে দু’ মিনিট ভাবলেন, তা হলেই হলো। ‘বট মানে গরুর ভূড়ি’, ‘কিডনির কারবার’ পড়েও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পাঠক, প্রভাব কিঞ্চিত পড়ে বলেই মনে হয়। ফেসবুকের কল্যাণে কখনো গল্পের শেয়ার দিলে অবাক কা-, আমার লিপিস্টিক দেওয়া সাজগোজ ছবিতে শত লাইক অথচ গল্পে লাইক খুব বেশি হলে বিশটা। তাও জানি না, লাইকগুলো পড়ে দেয় কিনা। আজকাল কাউকে গল্প পড়তে বলতে সংকোচ লাগে, নানা কারণেই তা।

শফিক হাসান : গল্প লেখার সার্থকতা খুঁজে পান? 
নাসিমা আনিস : নিজের আনন্দটুকু বাদ দিলে প্রায় সবটুকুই অন্ধকার। পাঠকের সংখ্যা নিয়েই তো আমার প্রবল সংশয়। এত এত পত্রিকা, কত পড়বে? কখন পড়বে? নিজের একটা অভিজ্ঞতা সুযোগ বুঝে পাঠকের সকাশে ঠেলে দিয়ে মজা দেখার দিন তো শেষ। সাধারণ পাঠক এখন অন্যত্র ব্যস্ত। ভালো পাঠকেরও সময় কমে এসেছে, তাদের দোষ দেওয়া যায় না। তারা খুব বেশি হলে বলেন, দেখলাম। আমি নিজেও অনেক সময় বলি, দেখলাম। তবু সারা জীবনে যদি গোটা দশেক ভালো গল্প লিখতে পারি আর পাঠকের কাছে একটাও পৌঁছে যায়, তো খুশিই হবো।

শফিক হাসান : প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল সমাজে গল্প পাঠের প্রাসঙ্গিকতা কী?
নাসিমা আনিস : ছোটগল্প আমাদের অল্প সময়ের জন্য একটু রিলিফ দেয়। একটা আড়ালে টেনে নিয়ে বলে, দেখো। এই পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু দেখাবো বলে আপনি যদি পুরো সময়টুকু শুধু দেখার ইশারাই দিয়ে ক্লান্ত করে ফেলেন তো তিনি একবার দুবার যাবেন, পরে ভেগে যাবেন। প্রাসঙ্গিক জিনিস তো তার আরো রয়েছে। হ্যাঁ, আমি তো গল্পটাকে বিনোদনই শুধু বলছি না, একটা অভিজ্ঞতাও। তিনি দেখান, অপূর্ব করে দেখান, লেখকের চোখে দেখার এই মজাটা, যন্ত্রণাটা, রিলিফটা তিনি নিতে পারেন নিজের করে। আমি কবিতা পছন্দ করি তারচেয়ে বেশি পছন্দ করি কবিদের গল্প, বুদ্ধদেব বসুর ‘আমরা তিনজন’ পড়ে আমি এখনো ঢুঁকরে উঠি, প্রেম কাকে বলে! আজকের দিনেও হয়ত এমন লেখা হচ্ছে আমার পড়া হচ্ছে না। শিল্পসাহিত্য নিজের জিনিস, পাঠক নিজের মতো উপভোগ করবেন, পড়বেন। পরিবর্তনশীল সমাজে লেখকও তো বসে নেই, তিনিও পাল্টাচ্ছেন, গল্পও পাল্টাচ্ছে, উপস্থাপনাও। ইতোমধ্যে দেখেন রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের পরিসর কোথায় এসে নেমেছে। ব্যাপারটা এমন, ভাইরে বেশি সময় তোমার নিবো না, জাস্ট দশ মিনিট। পাঠক অকারণ দশ মিনিটই বা নষ্ট করবেন কেন? লেখককে আরো সমকালীন হওয়া দরকার।

শফিক হাসান : একজন পাঠক আপনার গল্প পড়বে কেন?
নাসিমা আনিস : পাঠক আমার গল্প পড়বে কারণ তারা গল্প পড়তে ভালোবাসে। (আগের প্রশ্নের উত্তর মনে রাখবেন না)। আমার গল্পে গল্প থাকে, প্রত্নতাত্ত্বিক খনন করা লাগে না। এর বেশি কিছু যদি খুঁজে পান যেটা আমি ভেবে লিখেছি কিংবা লিখি নাই, সেটা আমার কপালে গুণ।

শফিক হাসান : বাংলা সাহিত্যে গল্পের যে নতুন ধারা তৈরি হয়েছে, সে প্রেক্ষাপটে আপনার লিখন প্রস্তুতি কেমন?
নাসিমা আনিস : এখন যারা লিখছেন তাদের ব্যাপারে আমি মোটামুটি অবগত আছি। নতুন ধারা বলতে বিশেষ কোন ধারা বলছেন সেটা বুঝতে পারছি না। গল্পের বিষয় উপকরণ প্রতিনয়ত পাল্টাচ্ছে। বর্ণনাও একেক লেখকের একেক রকম, উপস্থাপনাও, দর্শনের কথা বাদ দিলাম। পরম্পরাহীনতা বা শিকড়কে অস্বীকার করার প্রবণতাও তো দেখি। গল্পহীন গল্প দিয়েও পাঠককে আকৃষ্ট করার কারো কারো ক্ষমতা রয়েছে। তবে আমার বরাবর মনে হয়েছে ছোটগল্প খুব সম্ভবনাময় একটা অঙ্গন। এটা একটু যত্ন করেই ব্যবহার করা উচিত। 

আমার কোনো আলাদা প্রস্তুতি নেই, সব সময় হাতের কাছে যা পাই তাই পড়ি, নিজের মতো ভাবি, নিজের মতোই প্রকাশ করি। আর গল্প তো কেউ লেখেন না, উপস্থাপন করেন, সময়ের আগে যিনি সময়কে ধরতে পারেন আমি সে রকম প্রতিভাবান নই। সময়ই আমার বড় শিক্ষক।

শফিক হাসান : গল্পের ভবিষ্যত নিয়ে আপনি কতখানি আশাবাদী?
নাসিমা আনিস : বলেছি গল্প খুবই সম্ভবনাময় সাহিত্য। একটা গল্প বলার গুণে কত না সম্ভবনা তৈরি করে। আমি ছোটবেলায় মায়ের মুখে যে সব গল্প শুনেছি, তাঁর শৈশবের, কৈশোরের। সেগুলো লিখতে গিয়ে আমি হিমশিম খাই, গল্পে বাঁধতে না পেরে উপন্যাসে চলে যাওয়াই আমার উপন্যাসের ভাগ্য। এটা আমার সীমাবদ্ধতাও। ‘চন্দ্রভানুর পিনিস’ উপন্যাসের প্রতিটি ঘটনা মায়ের মুখে নানা সময়ে নানা রকমভাবে শোনা। গল্পে লিখতে গিয়ে আমি দিশাহারা হয়েছিলাম। কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের ‘কথা’য় ‘কয়েকটি আশ্চর্য রাত’ শিরোনামে একটা গল্প লিখেছিলাম। লেখার অনেক পরে দেখেছি, যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল সেটা সফল হয়নি। আমার মনে হয় গল্প আমরা সবাই একটাই করি সেটা নিজের গল্প, খুব বেশি হলে নিজেদের গল্প, কে কীভাবে গল্পটা বলে বেরিয়ে এলাম সেটাই আসল।
নানা বিষয় নিয়ে যেমন এখন গল্প লেখা হচ্ছে তেমনি নানা প্রকরণও পরীক্ষা হচ্ছে। গল্পের ভূগোল এখন দেশ ছাড়িয়ে গেছে, আশার কথা। অনেকেই প্রশ্ন করেন, আমরা কতটা বিশ্বমানের? অনেক ভালো গল্প আমাদের রয়েছে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সৈয়দ শামসুল হক, শওকত ওসমান, শওকত আলী থেকে হালের অদিতি ফাল্গুনী পর্যন্ত। অনুবাদ করে ছড়িয়ে দিতে পারলে একটা কা- হয়ে যেতে পারে।

শফিক হাসান : বিশ্বসাহিত্যে বাংলা গল্পের স্থান কোথায়?
নাসিমা আনিস : আমার ঠিক জানা নেই রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কতজন উপযুক্ত বাঙালি গল্পকারের গল্প অনুবাদ হয়েছে। স্থান পেতে হলে তো জানান দিতে হবে। বিষয় বৈচিত্র্যে কিংবা ভাবের গভীরতায় বিশ্বমানের অনেক লেখক ও লেখা আমাদের রয়েছে কিন্তু সে সব পৌঁছাচ্ছে কিনা আমি জানি না। আমরা দেখি নোবেল বা বুকার না পেলে বাইরের দেশের কোনো লেখকের লেখা আমরা পড়ি না। অনুবাদ হয়ে এলেও আমাদের সাধারণে বাজার পায় না সেটা। তো অন্য দেশের ক্ষেত্রেও এমনই প্রযোজ্য। তবু আগ্রহী কিছু পাঠক কালে কালে থাকে। তাদের সকাশে যদি আমাদের অনুবাদটা পৌঁছে দেওয়া যায় তো ভালোই হয়। আর একটা কথা, আমাদের নিজেদেরও নিজেদের গল্প মূল্যায়ন করার ক্ষমতা দেখাতে হবে। সমালোচনা সাহিত্যের খুব অভাব বোধ করি। 

শফিক হাসান : আপনার গল্প লেখার প্রেরণা কী?
নাসিমা আনিস : আমার শৈশব কৈশোর এবং যৌবনের খানেকটা খুব ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে বেড়ে উঠেছে। বলতে গেলে মিছিলে বেড়ে ওঠা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ভবনে ‘৬৫ থেকে ‘৮১ পর্যন্ত একনাগাড়ে, ‘৯৭ পর্যন্ত মাঝে মাঝে। জহুরুল হক হল (ইকবাল হল), হলের মাঠ, মাঠে লাশ নিয়ে প্রতিবাদ মিছিল, ২৫ থেকে ২৭ মার্চের মহাদুর্যোগ ডিঙিয়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। শৈশবের কলোনি, তেঁতুল গাছের নিচে বিহারি করিমের দুগ্ধখামার, হলের অপূর্ব বাগান, ফুল চুরি, আমার আজিমপুর স্কুল, পলাশি বাজার। বাসার সামনে আর স্কুলের বিশাল মাঠ। খেলেছি খুব। মাঠকে, আকাশকে দেখেছি। একটা মাঠ সকালে, দুপুরে কি সন্ধ্যায় কীভাবে পাল্টে যায়। ঋতু পরিবর্তনে মাঠ, শীতে এক রকম, বর্ষায় অন্যরূপ। মাঠের উপর উন্মুক্ত আকাশ মানুষের মনের উপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রাখে। ‘৭১-এ ঢাকা থেকে পালিয়ে গ্রামে কুমিল্লায় এক বছর থাকা খুব শক্তিশালী সময় আমার জীবনে। খুব গভীর একটা সময়। এত সঞ্চয় আর কোনো বছরে নাই। স্বাধীনের পরও বহু বছর খুব অস্থির পরিস্থিতির ভিতর দিয়ে যেতে হয়েছে পুরো জাতিকে। বেতন কম, মুজুরি কম, গ্রামগুলো হতশ্রী, দারিদ্র্য সীমাহীন। দেশ স্বাধীনের পর মানুষ ভেবেছিল এক/দুই মাস কি ছয় মাসের মধ্যে সবাই খুব উচ্চ একটা জীবন পেয়ে যাবে। যুদ্ধে যারা গেলো তারাও খুব ধৈর্যহীনতায় ভুগতে লাগলো। স্কুলে যাওয়ার পথে দেখতাম পলাশির ছেলেরা ডজনে ডজনে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে গুলতানি মারছে সারাদিন। সকালে দেখি যাওয়ার পথে, দুপুরে দেখি স্কুলের তিনতলা জানালা থেকে, বিকেলে আসার সময়ও দেখি ডজন ডজন। এদের কোনো কাজ নেই। পাড়ায় পাড়ায় গু-া তৈরি হলো। মিলন গু-া অমুক গু-া তমুক গু-া, এরা মুক্তিযুদ্ধ করেছে। সবার এক মনোভঙ্গি আলাউদ্দীনের আশ্চর্য চেরাগটা তো বঙ্গবন্ধুর কাছে আছে তিনি এখনো কেন তা প্রয়োগ করছেন না! রক্ষীবাহিনীর দাপট বেড়ে গেলো, ভিতরে ভিতরে গণবাহিনীর অদ্ভুত প্রতিকার কি প্রতিরোধ। এ সবের ঝাঁজ পেতাম কোনো না কোনোভাবে। 

আরো শৈশবে ‘৬৬ জগন্নাথ হলের বাংলো, প্রায়ই শেষ রাতে আর্মিদের বুটের শব্দ, বাসার সামনে গোলাপের ঝাড়, জোড়া কামিনীর তলে গোখরো, বাবার অফিসের পিয়ন প্রিয়নাথের হাত ধরে হলের ছেলেদের রুম থেকে সিগারেটের প্যাকেট সংগ্রহ, বাবার হাতে মার, কত বলবো। এমনকি সেই পঙ্গু লোকটা, যাকে তার কিশোর ছেলে প্রতিদিন বিকেলে চাকাওয়ালা কাঠের বাক্সে বসিয়ে ঘরঘর আওয়াজ করে ভিক্ষে করতে নিয়ে যেতো, তখন আমি স্কুলেই যাই না। যার একটা বিচিত্র এবং উজ্জ্বল শৈশব-কৈশোর না থাকে তার লেখক হওয়া খুব মুশকিল। হ্যাঁ, সবচেয়ে বেশি প্রভাবক আমার মা, যিনি খুব গল্পের বই পড়তেন আর যাঁর এক ট্রাংক গল্পের বই পেয়ে হাতে চাঁদ পেয়েছিলাম, আগেই বলেছি। আর গল্পের লোকের সঙ্গেই তো গভীরভাবে বাস, যিনি আমার সমস্ত প্রণয়ের অধিবাস, আমাদের লেখালেখির চেয়ে গল্প করার তরিটা খুব প্রবহমান তো, এটাও প্রকারান্তরে গল্পের প্রেরণাই।

Post a Comment

0 Comments