![]() |
| আরজ আলী মাতুব্বর |
দেশটা প্রায় মৃত্যু পুরিতে পরিণত হয়েছে। মাঠ ঘাট বাজার সব যেন গোরস্থান আর শ্মশান শুধু লাশের মিছিল। দেশের প্রত্যেকটা হাসপাতাল ভরে গিয়েছে রোগী দিয়ে। ইদানীং ডাক্তার নার্সের খুবই সংকট হয়েছে। অনেক ডাক্তার নার্স নিজেরাও আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছে। চারদিকে শুধু শুন্যতা আর আহাজারি অর্থনীতি রাজনীতি আজ লাশের গণনায় আবদ্ধ। আজকে আনিস বেশ সুস্থ বোধ করছে গায়ের ব্যথাটা কমে গিয়েছে গতকালের তুলনায়। শফিক নামের এক ছেলে গতকাল ভর্তি হয়েছে তার ওয়ার্ডে বয়স একুশ বাইশ হবে। হঠাৎ শফিকের প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হলো তার সাথে বমি। বাইরে থেকে একজন তরুণ ডাক্তার আর নার্স প্রবেশ করলো। তারা দুজন শফিকের কাছে গিয়ে কি জানি পরামর্শ করলো। তারপর কিছুক্ষণ আগে যে বৃদ্ধ মানুষটিকে অক্সিজেন দেওয়া হয়েছিল সেটা খুলে শফিকের নাকে প্রবেশ করানো হলো। শফিকের আর্তনাদ কিছুটা কমলো। কিন্তু বয়স্ক মানুষটি ছটফট করতে লাগলো শ্বাসকষ্টের যন্ত্রণায়। কিছুক্ষণ পর লোকটি নিস্তেজ হয়ে গেলো ছটফটানি কমে গেলো। বায়ুসমুদ্রের এই পৃথিবীতে এক সেকেন্ডের বায়ুর অভাবে সে শেষ হয়ে গেলো। মহাবিশ্বের ধুলিকনায় মিশে গেলো তার আত্না। পুরো দৃশ্যটা ঘটে গেলো আনিসের চোখের সামনে এই ভয়ানক দৃশ্য তার শরীরকে হিম করে দিলো। চোখ বন্ধ করলো সে ভাবতে লাগলো জীবিত কোন মানুষের পক্ষেই মৃত্যু যন্ত্রণা অনুভব করা সম্ভব নয়। মরে যাওয়ার শেষ মুহূর্তে কি ভাবে মানুষ? আনিস হাসপাতালের ভর্তি হতে পেরেছে অনেকটা ভাগ্যগুণে। অনেকদিন বাসা থেকে বের হয়নি সে প্রায় দুইমাস। প্রশাসনও অনেক কড়া ছিলো। কিন্তু গেলো সপ্তাহে জরির জন্মদিন ছিলো,অনেকদিন জরির সাথে কথা হয়নি, দেখা হয় নি। জরির জন্মদিনের তারিখটা ভূলে যায় না আনিস।রাত বারোটায় একবার ফোন দিয়েছিলো জরিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য। ফোনটা রিসিভ হয়নি। তারপর সারারাত আর ঘুম ধরেনি খুব সকালে বাসা থেকে বেড়িয়ে নীলগঞ্জ এসেছে সে। রাস্তায় কোন গাড়ি চলাচল না করলেও গভীর রাত্রি থেকে ভোর পর্যন্ত কিছু অটো সি এন জি চলাচল করে। তারই একটা পেয়েছিলো সে রিজার্ভ ভাড়া দিয়ে এসেছে। এতো দ্রুত এসেছে যে যখন পৌঁছে গিয়েছে তখনও সকালের রেস কাটেনি। এতো বড় শহর একদম ফাকা কোন মানুষ নেই। পৌরসভার ঝাড়ুদাররা রাস্তা ঝাড়ু দিচ্ছে, কিছু নেড়িকুত্তার দল গোল হয়ে একপাশে শুয়ে আছে। ফাকা রাস্তায় হাটা ধরে আনিস তার উদ্দেশ্য কিছু জায়গায় ঘুরে বেড়ানো। জড়ির প্রত্যেক জন্মদিনে যে জায়গা গুলোতে ঘোরাঘুরি করা হতো। তখনও আনিসকে অনেক সকালেই আসতে হতো। একটা রেস্টুরেন্টে চোখ গেলো আনিসের এখানে একবার খেয়েছিলো সে জরির সাথে। এইসব রেস্টুরেন্টে আগে কখনো বসেনি আনিস জরির সাথেই প্রথম। খাবারের মেন্যুগুলো সবই বিদেশি। আনিস খুব বিব্রতবোধ করছিলো রেস্টুরেন্টের এই নতুন পরিবেশে এতটাই সংকুচিত হয়েছিল যে ঘামতে শুরু করেছিলো। আনিসের কাছে বাইরে খাওয়া মানেই সেটা হোটেল আর খাবার মেন্যু ভাত আর গরুর মাংস। রেস্টুরেন্টের খাবার অর্ডার দেওয়া থেকে শুরু করে বিল
দেওয়া পর্যন্ত সবকিছু জরি এতো চমৎকার ভাবে করলো যে মনে হয় এটা তার রান্নাঘর। বিলটাও জরি সবসময় নিজেই দিতো। জোরে হাটা ধরে আনিস একসময় লক্ষ করলো তার সামনে একটা পুলিশের পিকাপ। আনিসকে দেখে গাড়ি থেকে পুলিশ নেমে আসে কেন হাটছে জিজ্ঞেস করে তারা। আমতা আমতা করে আনিস কিছু বলতে পারে না। এক পুলিশ পিছনে থেকে বলে স্যার এই শালা বদমায়েশ আছে এতো কড়াকড়ির মধ্যেও সকালে বাইরে হইছে থানায় নিয়া গিয়া গোয়ায় বারি দিতে হবে। লজ্জা পায় আনিস গতকাল থেকে তার গায়ে সামান্য জ্বর ছিলো সাথে সামান্য একজন পুলিশ বুঝতে পারে। পুলিশরা পিছনে সরে যায় কোথায় জানি ফোন করে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটা গাড়ি চলে আসে আনিসকে গাড়িতে উঠিয়ে একটা স্কুলে নিয়ে আসা হয়। একটা কক্ষে তাকে ১৪ দিন থাকার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়। সেখানে আরও অনেক মানুষ। তিনদিন থাকার পরে আনিসের জ্বর আর তীব্র গলাব্যথা শুরু হয় । তারপর থেকে এখানে …
দুই
ছয়তলা বাসার তিন তলায় জরিরা থাকে। পুরো বাড়ি এখনও সম্পুর্ন হয়নি আরও হয়তো কিছুদিন লাগবে। মাস দুয়েক আগে ঢাকায় থাকার সময় জরির দাদী অসুস্থ হয় তাকে দেখতে বাড়িতে আসে সে৷ তার কয়েকদিন পরেই করোনায় আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায় দেশে সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। সেই সাথে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়। মেডিকেলের শিক্ষার্থী হওয়ার কারণে জরির মা মহা খুশি তারমেয়েকে এই বিপদের সময় মেডিকেলে থাকতে হচ্ছে না। গতকাল সারারাত ঘুমায়নি সে অনেক রাত পর্যন্ত সিনেমা দেখেছে তার বড় বোনের সাথে গল্প করেছে ফোনে অনেকক্ষণ। তারপর নাশিদ ফোন দিয়েছিলো, নাশিদের সাথে ভোর অব্ধি কথা হয়েছে আজকে জরির জন্মদিন এজন্য নাশিদের কত প্ল্যান ছিলো কিন্তু দেশের এই অবস্থায় সব প্ল্যান মাটি। বেশ ক্লান্ত শরীর নিয়ে তিনতলার বারান্দার ব্যালকনিতে যায় জরি আজকের আকাশ খুবই চমৎকার। চারদিকে এতো সুনসান নীরবতা পরিবেশটা অসাধারণ লাগে জরির। পৃথিবীতে নাকি অক্সিজেনের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে বুকভরে শ্বাস নেয় সে।
আজকের সকালের আকাশ খুবই সুন্দর। সাদা আকাশের মধ্যে দিয়ে কয়েকটি ধবধবে সাদা বক উড়ে গেলো। কিছুদিন আগে গ্রামেই বক দেখা যেতো না আর এখন শহরেও দেখা যাচ্ছে। পাখিরা তাদের বাসা ছেড়ে বের হচ্ছে খাদ্যের সন্ধানে। এখন মানুষ বের হয় না পাখিরা বের হয়। পৃথিবীটা কি তাহলে পাখিদের হয়ে যাচ্ছে?
হাতের দামী আইফোনটা দিয়ে আকাশের চমৎকার একটা ছবি তুলে সে। ছবি তুলতে গিয়ে হঠাৎ তার চোখ বড় রাস্তার উপরে গিয়ে পড়ে,
একটা পুলিশের পিকআপ গাড়ি চলছে, তার পিছনে
আর একটা খোলা জিপ ছুটছে।
লেখকঃ সোনাতলা, বগুড়া।


2 Comments
অভিনন্দন
ReplyDelete❤
ReplyDelete