Advertisement

উন্মেষ

একটি চুম্বনের দীর্ঘ অপেক্ষা : জয়শ্রী দাস

joyshree das weeklyunmesh.com

দেবিকা শকুনের মতো চোখ নিয়ে সামনের দোকানের চালাঘরের নিচে দাঁড়ানো তরুণ-তরুণীকে দেখছে। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।

দীর্ঘ সোনালি চুলের দেবিকা দেখতে ভালো, চোখ দুটো মায়াভরা। মাঝবয়স পেরিয়ে গেছে তার। তার দুটো ছেলে স্কুল শেষ করেছে কিছুদিন আগে। সে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এসেছে, কারণ সে এখানকার পিএইচডির ছাত্রী। হঠাৎ করে সামনের তরুণ-তরুণী দুজন দুজনাকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে চুম্বন করল।

দেবিকার বুক সমুদ্রের গর্জে ওঠা ঢেউয়ের মতো উঠানামা করতে করতে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। তার মনে সুদীর্ঘকাল ধরে ইচ্ছা—এমন বৃষ্টির দিনে কেউ তাকে বুকে চেপে আদর করতে করতে তার ঠোঁটে দীর্ঘ চুম্বন করুক।

এই কাজটি তার স্বামীর দ্বারা হওয়া সম্ভব নয়, কারণ তার স্বামী কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে তার ঠোঁটে চুম্বন করেননি।

—কিরে দেবিকা না? কেমন আছিস? এখানে কী করছিস?

দেবিকা চমকে পিছনে তাকিয়ে দেখল, তার বন্ধু হাসান দাঁড়ানো। হাসান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এবং তার ক্লাসমেট। যোগাযোগ নেই অনেক কাল।

—কেমন আছিস?
—ভালো। এত সুন্দর হয়েছিস কিভাবে, দেবী?
—আমি তো সুন্দর হয়েছি। আর তুই কালো তো ছিলি, আরও কালো হয়েছিস। ভূত কোথাকার!
—ভূত না রে, আমি তোর কৃষ্ণ। তুই না আমাকে এক সময় ক্লাসে কৃষ্ণ ডাকতিস।
—তাই তো। ক্লাসের সবাই তখন আমাকে রাধা ডাকত। তোর কি শরীর খারাপ, হাসান?
—তুই বুঝলি কী করে?
—এমনি। আমিও ভালো নাই রে, শ্বাসকষ্ট আছে। তোর কী সমস্যা?
—সাইনাসের প্রবলেম হচ্ছে, গলা ব্যথা। ডাস্ট অ্যালার্জি প্রচণ্ড রকমের। চল, দুজনে রিকশায় ঘুরি। বৃষ্টিটা শেষ হয়ে আসছে। সন্ধ্যা হয় হয়। কী সুন্দর! আকাশটা দেখ।
—বোটানিক্যাল গার্ডেনটা হয়ে লেকপাড়ে ঘুরে বেড়াই চল।

দুজন অতৃপ্ত নর-নারী দুঃখ ভাগ করা শুরু করল।

—হাসান, তোর বাচ্চা কয়জন? বউ বুঝি তোকে অনেক ভালোবাসে!
—একজন। বউ এক সময় ভালোবাসত, এখন সে মানসিকভাবে অসুস্থ। আমারও শরীর খারাপ—সব মিলিয়ে ভালো নেই।

কোনো একটা জঙ্গল থেকে ভাট ফুলের গন্ধ ভেসে আসছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের রাস্তাগুলো সন্ধ্যার আলো নিয়ে লুকোচুরি খেলছিল। আকাশ থেকে সবার অবচেতনে কে একজন এদের দু’জনের ভাগ্য নির্ধারণ করে যাচ্ছিল।

এরপর দেখা হতে লাগল নিয়মিত। এক সময় কৃষ্ণচূড়া ঝরে গেল। শীত এলো। পুকুরপাড়ে সেই বকুল ফুলের গাছটার ধারে এক চাদরে ঢেকে বসে আছে দুজন। অসুখের আক্রমণে কামনার ধার ক্ষীণ হয়ে আসছে। তবুও তারা দুজন দুজনাকে শরীরের উত্তাপ ছড়িয়ে দিতে লাগল।

পচা সমাজের কাছে পরকীয়ার শাস্তি পাবে হয়তো এ সম্পর্ক। কিন্তু তাদের আনন্দের ভাগীদার শুধু তারা দুজন। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে দেবিকাকে সহযোগিতা করতে লাগল হাসান। লাইব্রেরির টেবিলের নিচে দুজনার পা জড়িয়ে রাখে দু’জনকে।

তারা জানে, এ পৃথিবীতে তাদের আয়ু দীর্ঘ নয়। প্রায়ই দেবিকা অসুস্থ হয়ে পড়ে। ব্যাগের মধ্য থেকে ইনহেলারটি খুঁজে এনে দেয় হাসান।

বাড়ি ফিরেও তার দীর্ঘ আলাপ থাকে হাসানের সঙ্গে। তাদের মনের মধ্যে মায়া জমেছে, শরীর নয়। শরীরের আকর্ষণকে ছিন্ন করা গেলেও মায়ার আকর্ষণ শেষ হয় না।

দেবীর শখের পড়াশোনা আর ভালো লাগছে না। শরীর বেশ খারাপ। সে অপলক নেত্রে, সেদিন বৃষ্টি ঝরে যাওয়া সন্ধ্যার অন্ধকারে হাসানকে বলল,
‘আমার শেষ ইচ্ছেটি তুমি পূরণ করো।’

হাসান দেবিকাকে বুকের মধ্যে পিষে আদর করতে করতে তার ঠোঁটে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর চুম্বন করল। চুম্বনের ঝড়ে কেঁপে উঠছে বারবার দেবিকা, তবু তার আরও চাই, আরও।

সেই রাতে বাড়ি ফিরে একাকিত্বের বিছানায় হাসান এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করল।

হাসানের মৃত্যুর খবরটি পরদিন সকালে দেবিকার কাছে পৌঁছে গেল। শরীরের প্রতিটি পাঁজর তার অসাড় হয়ে আসতে লাগল। সূর্যের আলোটি যখন তীব্র আলোয় পৃথিবীকে আলোকিত করার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখন দেবিকা পরপারের সিঁড়িতে পা রাখল।


Post a Comment

0 Comments